আজ ১৯ ফেব্রুয়ারী। বৃহত্তর মতলবের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াল দূর্ঘটনা ও গভীর শোকাবহ দিন আজ। ২০০৫ সালের শোকস্তব্ধ ওই ঘটনার ২১ বছর পূর্ণ হলেও এখনও থামেনি নিহত স্বজনদের আহাজারি।
১৯ শে ফেব্রুয়ারি রাত ১১টায় এমভি মহারাজ নামের লঞ্চটি কয়েক শতাধিক যাত্রী নিয়ে সদরঘাট ত্যাগ করে। রাত ১১ টার দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর পাগলা নামক স্থানে ঝড়ের কবলে পড়ে লঞ্চটি উল্টে গভীর অতলে ডুবে যায়।প্রায় তিন শতাধিক যাত্রী নিয়ে যাত্রা করা লঞ্চটির মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় শত শত নারী-পুরুষ প্রাণ হারান। যাত্রীদের বেশিরভাগই ছিল মতলব উত্তর এবং দক্ষিণের।
সেই রাতে দূর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো মতলবে পড়ে যায় শোকের ছাঁয়া। লাশের গন্ধ আর চারিদিকে কেমন যেনো, হাউমাউ কান্নার আওয়াজ। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠে মতলবের আকাশ-বাতাস। একের পর এক লাশগুলি ভেসে উঠে নদীতে। ট্রলারযোগে লাশগুলো মতলব থানায় এনে জমা করতে থাকে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়, হঠাৎ ঘন কালো মেঘ আর ঝোড়ো হাওয়ায় নদী উত্তাল হয়ে ওঠে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই লঞ্চটি দুলতে দুলতে একসময় উল্টে যায়। অনেকেই সাঁতার জানতেন না, আবার অনেকেই ঝড়ের তীব্র স্রোতে ভেসে যান। মুহূর্তেই নদী হয়ে ওঠে লাশের স্তূপ।
লঞ্চ দুর্ঘটনায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের মধ্যে ছিলেন- নারায়নপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী, তার কন্যা মতলব কঁচি-কাঁচা প্রি-ক্যাডেট স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর মেধাবী ছাত্রী শিলাত জাহান অর্থি, উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি আব্দুল হাই মাস্টার, আইসিডিডিআরবির ডাক্তার মো. মাসুম, দগরপুরের প্রকৌশলী ফারুক দেওয়ান, মতলব বাজারের সার ব্যবসায়ী ইয়াসিন মৃধা, ডেফোডিল ইউনির্ভাসিটির কর্মকর্তা ফরুক দেওয়ান ও তার পরিবার, দশপাড়া গ্রামের মফিজুল ইসলম, বাইশপুর গ্রামের ছোট খোকন ও বড় খোকন, মাসুদ, মতলব উত্তরের বারহাতিয়া গ্রামের ভাঙ্গারী ব্যবসায়া শাহ আলম, পাঠানচকের ইয়াছিন, নিশ্চিন্তপুরের টিপু শিকদার, উত্তর নিশ্চিন্তপুরের বাদলসহ নাম না জানা অনেকে।
উদ্ধারকৃত লাশগুলো তখন মতলব থানার সামনে সারিবদ্ধ ভাবে তাবু টানিয়ে রাখা হয়েছিল। অধিকাংশ লাশের মুখমণ্ডলের শরীর গলে যাওয়ায় তাদের চিনতে আত্মীয় স্বজনদের হিমশিম খেতে হয়েছিল। লাশের পরনে থাকা পোশাক এবং জন্মগত কোন চিহ্ন দেখে অনেক লাশ শনাক্ত করেছে স্বজনরা। আর যে সকল লাশের কোনো পরিচয় পাওয়া যায়নি তাদের ছবি তুলে তাদের লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে ঢাকিরগাঁও রিয়াজুল জান্নাত কবরস্থানে গনহারে দাফন করা হয়।
মহারাজ লঞ্চডুবি থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া পৌলপাড়া গ্রামের মোঃ সফিকুল ইসলামের ছেলে স্বপন বলেন, সেই রাতের কথা মনে পরলে এখনও শরীর শিউরে উঠে। আল্লাহর অশেষ রহমতে সেইদিন প্রানে রক্ষা পেয়েছি।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী এই লঞ্চডুবিতে নিহতের সংখ্যা ছিল ১১২ জন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষের হিসাবমতে, নিহত হয়েছিল ৩ শতাধিক এর বেশি। গত ২০০৬ সালে সরকারিভাবে নিহতদের পরিবারের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে মোট ২৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা ও ১ মেট্রিকটন চাল প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে তাদের জন্য আর কোনো বরাদ্দ আসেনি।
দুর্ঘটনার ২১ বছর পেরিয়ে গেলেও ক্ষত আজও দগদগে। প্রতিবছর এই দিনটিতে নিহতদের স্বজনরা তাদের স্মরণ করে শোক সভা মিলাদ ও দোয়ার আয়োজন করে। আবেগতাড়িত হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রিয়জনদের উৎস্বর্গ করে নানান স্মৃতিময় লেখা প্রকাশ করেন। অনেকে গনকবরের পাশে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তাদের ধারণা, এমভি মহারাজ লঞ্চে না পাওয়া নিহত স্বজনরা এখানেই আছেন চিরনিদ্রায়।
এমভি মহারাজ ট্র্যাজেডি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি মতলববাসীর হৃদয়ে গভীর ক্ষতের নাম। প্রজন্ম বদলালেও ১৯ ফেব্রুয়ারি এলেই ফিরে আসে সেই বিভীষিকাময় দিন, ফিরে আসে হারানো মুখগুলো। ২১ বছর পরও প্রশ্ন রয়ে গেছে, নদীপথে নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত? আর কত প্রাণ গেলে আমরা শিক্ষা নেব? আজ ভয়াল ১৯ ফেব্রুয়ারি, শ্রদ্ধা আর অশ্রুতে স্মরণ করছি এমভি মহারাজের সব শহীদ যাত্রীদের।

বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আজ ১৯ ফেব্রুয়ারী। বৃহত্তর মতলবের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াল দূর্ঘটনা ও গভীর শোকাবহ দিন আজ। ২০০৫ সালের শোকস্তব্ধ ওই ঘটনার ২১ বছর পূর্ণ হলেও এখনও থামেনি নিহত স্বজনদের আহাজারি।
১৯ শে ফেব্রুয়ারি রাত ১১টায় এমভি মহারাজ নামের লঞ্চটি কয়েক শতাধিক যাত্রী নিয়ে সদরঘাট ত্যাগ করে। রাত ১১ টার দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর পাগলা নামক স্থানে ঝড়ের কবলে পড়ে লঞ্চটি উল্টে গভীর অতলে ডুবে যায়।প্রায় তিন শতাধিক যাত্রী নিয়ে যাত্রা করা লঞ্চটির মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় শত শত নারী-পুরুষ প্রাণ হারান। যাত্রীদের বেশিরভাগই ছিল মতলব উত্তর এবং দক্ষিণের।
সেই রাতে দূর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো মতলবে পড়ে যায় শোকের ছাঁয়া। লাশের গন্ধ আর চারিদিকে কেমন যেনো, হাউমাউ কান্নার আওয়াজ। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠে মতলবের আকাশ-বাতাস। একের পর এক লাশগুলি ভেসে উঠে নদীতে। ট্রলারযোগে লাশগুলো মতলব থানায় এনে জমা করতে থাকে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়, হঠাৎ ঘন কালো মেঘ আর ঝোড়ো হাওয়ায় নদী উত্তাল হয়ে ওঠে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই লঞ্চটি দুলতে দুলতে একসময় উল্টে যায়। অনেকেই সাঁতার জানতেন না, আবার অনেকেই ঝড়ের তীব্র স্রোতে ভেসে যান। মুহূর্তেই নদী হয়ে ওঠে লাশের স্তূপ।
লঞ্চ দুর্ঘটনায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের মধ্যে ছিলেন- নারায়নপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী, তার কন্যা মতলব কঁচি-কাঁচা প্রি-ক্যাডেট স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর মেধাবী ছাত্রী শিলাত জাহান অর্থি, উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি আব্দুল হাই মাস্টার, আইসিডিডিআরবির ডাক্তার মো. মাসুম, দগরপুরের প্রকৌশলী ফারুক দেওয়ান, মতলব বাজারের সার ব্যবসায়ী ইয়াসিন মৃধা, ডেফোডিল ইউনির্ভাসিটির কর্মকর্তা ফরুক দেওয়ান ও তার পরিবার, দশপাড়া গ্রামের মফিজুল ইসলম, বাইশপুর গ্রামের ছোট খোকন ও বড় খোকন, মাসুদ, মতলব উত্তরের বারহাতিয়া গ্রামের ভাঙ্গারী ব্যবসায়া শাহ আলম, পাঠানচকের ইয়াছিন, নিশ্চিন্তপুরের টিপু শিকদার, উত্তর নিশ্চিন্তপুরের বাদলসহ নাম না জানা অনেকে।
উদ্ধারকৃত লাশগুলো তখন মতলব থানার সামনে সারিবদ্ধ ভাবে তাবু টানিয়ে রাখা হয়েছিল। অধিকাংশ লাশের মুখমণ্ডলের শরীর গলে যাওয়ায় তাদের চিনতে আত্মীয় স্বজনদের হিমশিম খেতে হয়েছিল। লাশের পরনে থাকা পোশাক এবং জন্মগত কোন চিহ্ন দেখে অনেক লাশ শনাক্ত করেছে স্বজনরা। আর যে সকল লাশের কোনো পরিচয় পাওয়া যায়নি তাদের ছবি তুলে তাদের লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে ঢাকিরগাঁও রিয়াজুল জান্নাত কবরস্থানে গনহারে দাফন করা হয়।
মহারাজ লঞ্চডুবি থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া পৌলপাড়া গ্রামের মোঃ সফিকুল ইসলামের ছেলে স্বপন বলেন, সেই রাতের কথা মনে পরলে এখনও শরীর শিউরে উঠে। আল্লাহর অশেষ রহমতে সেইদিন প্রানে রক্ষা পেয়েছি।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী এই লঞ্চডুবিতে নিহতের সংখ্যা ছিল ১১২ জন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষের হিসাবমতে, নিহত হয়েছিল ৩ শতাধিক এর বেশি। গত ২০০৬ সালে সরকারিভাবে নিহতদের পরিবারের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে মোট ২৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা ও ১ মেট্রিকটন চাল প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে তাদের জন্য আর কোনো বরাদ্দ আসেনি।
দুর্ঘটনার ২১ বছর পেরিয়ে গেলেও ক্ষত আজও দগদগে। প্রতিবছর এই দিনটিতে নিহতদের স্বজনরা তাদের স্মরণ করে শোক সভা মিলাদ ও দোয়ার আয়োজন করে। আবেগতাড়িত হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রিয়জনদের উৎস্বর্গ করে নানান স্মৃতিময় লেখা প্রকাশ করেন। অনেকে গনকবরের পাশে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তাদের ধারণা, এমভি মহারাজ লঞ্চে না পাওয়া নিহত স্বজনরা এখানেই আছেন চিরনিদ্রায়।
এমভি মহারাজ ট্র্যাজেডি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি মতলববাসীর হৃদয়ে গভীর ক্ষতের নাম। প্রজন্ম বদলালেও ১৯ ফেব্রুয়ারি এলেই ফিরে আসে সেই বিভীষিকাময় দিন, ফিরে আসে হারানো মুখগুলো। ২১ বছর পরও প্রশ্ন রয়ে গেছে, নদীপথে নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত? আর কত প্রাণ গেলে আমরা শিক্ষা নেব? আজ ভয়াল ১৯ ফেব্রুয়ারি, শ্রদ্ধা আর অশ্রুতে স্মরণ করছি এমভি মহারাজের সব শহীদ যাত্রীদের।

আপনার মতামত লিখুন